ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরাইলে বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ, তদন্তের দাবি স্বজনদের বিয়ের পর সম্পর্কের টানাপোড়েন ঘিরে নানা প্রশ্ন, বাবার কাঁধে একমাত্র সন্তানের লাশ—এর চেয়ে ভারী দৃশ্য হয়তো কোনো বাবার জীবনে আর কিছু হতে পারে না। যে সন্তানকে ঘিরে ছিল একটি পরিবারের সব স্বপ্ন, সেই একমাত্র সন্তান প্রিন্স (১৮) এখন নেই। স্বজনদের ভাষ্য, বাবা-মা ও বড় বোনকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন প্রিন্স।
কিন্তু জীবনের শেষদিকে স্ত্রী জেবাকে ঘিরে সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক চাপ ও মানসিক আঘাত তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। প্রিন্সের মৃত্যুর পর থেকেই তার পরিবার ও পরিচিতজনদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে একের পর এক প্রশ্ন—কী এমন ঘটেছিল, যার পরিণতিতে মাত্র ১৮ বছর বয়সী এক তরুণকে জীবন থেকে ছিটকে পড়তে হলো? তার মৃত্যুর পেছনে কি শুধুই ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক চাপ, অপমান ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ?
স্বজনদের দাবি, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
ভালোবেসে বিয়ে, এরপর সমঝোতা পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে পরিবারের সদস্যদের না জানিয়ে প্রিন্স ও জেবা ভালোবেসে আদালতের মাধ্যমে বিয়ে করেন। তবে তখন উভয়েরই আইনগতভাবে বিয়ের নির্ধারিত বয়স পূর্ণ হয়নি বলে দুই পরিবারের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। ওই সমঝোতা অনুযায়ী, তারা পরস্পরের বাড়িতে যাতায়াত করবে এবং বয়স পূর্ণ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে—এমনটাই পরিবারটির দাবি। প্রিন্সের পরিবারের অভিযোগ, তারা মনে করেছিলেন দুই পরিবারের মধ্যে হওয়া সমঝোতা আন্তরিক ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। এসএসসি পরীক্ষার পর বদলে যায় পরিস্থিতি? স্বজনদের অভিযোগ, জেবার পরিবারের পক্ষ থেকে মূলত তার এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত বিষয়টি সাময়িকভাবে মেনে নেওয়া হয়েছিল। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর পারিবারিক চাপের কারণে জেবাকে দিয়ে প্রিন্সের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
পরিবারের দাবি, একপর্যায়ে প্রিন্সের সঙ্গে জেবার যোগাযোগ সীমিত বা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন প্রিন্স। স্বজনদের ভাষ্য, স্ত্রীকে নিয়ে তার মধ্যে প্রবল আবেগ ও বিশ্বাস কাজ করত। দীর্ঘ সময় ধরে জেবার সঙ্গে যোগাযোগের অপেক্ষায় থাকতেন তিনি। পরিবারের একজন সদস্যের ভাষ্য, প্রিন্সের কাছে জেবা শুধু স্ত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন তার ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্ন ও প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু। ফলে হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া তার ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলেছিল বলে পরিবারের ধারণা। ৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনা ঘিরে বড় প্রশ্ন পরিবারের দাবি, গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রিন্স তার স্ত্রী জেবার সঙ্গে দেখা করতে এবং বিচ্ছেদের বিষয়টি সরাসরি জানতে জেবার ফুফুর বাড়ি সাং হিজলহাটি, ডাকঘরঃ বাড়ইপাড়া, উপজেলাঃ কালিয়াকৈর, জেলাঃ গাজীপুর যান। স্বজনদের অভিযোগ, সেখানে যাওয়ার পর প্রিন্সকে অপমান ও মারধর গুম খুনের কৌশল,গুরুতর ক্ষতির পরিকল্পনা করা হয়েছিল এমন আশঙ্কাও পরিবারের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। পরিবারের দাবি, ওই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রিন্সের মৃত্যুর আগের সময়কার প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে পারে। স্বজনদের আরও অভিযোগ, জেবার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেও প্রিন্স শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেননি। এতে তিনি গভীরভাবে আঘাত পান। পরে কোনোভাবে সেখান থেকে ফিরে আসেন তিনি।
পরিবারের কাছে কিছুই প্রকাশ করেননি প্রিন্স সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনার পরও প্রিন্স পরিবারের সদস্যদের কাছে নিজের কষ্টের কথা পুরোপুরি প্রকাশ করেননি।
বড় বোনের ভাড়া বাসা সাং মাছিহাতা ইউপিস্হ গ্রামঃ পাঘাচং উপজেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ফিরে তিনি স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করেন। বাইরে থেকে তাকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে তিনি প্রচণ্ড কষ্টে ছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা এখন মনে করছেন।
পরিবারের দাবি, নিজের অভিমান ও মানসিক যন্ত্রণা কাউকে বুঝতে না দিয়ে তিনি নীরবে সবকিছু সহ্য করছিলেন। এর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আত্মহত্যা করেন। প্রিন্সের মৃত্যুর পর তার পরিবার এখন বারবার ফিরে যাচ্ছে সেই শেষ কয়েকটি দিনের কথায়। তাদের প্রশ্ন—কী ঘটেছিল ওই সময়? কার সঙ্গে কী কথা হয়েছিল? কারও চাপ বা আচরণ কি তার মানসিক অবস্থাকে আরও বিপর্যস্ত করেছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে তারা তদন্ত দাবি করছেন। ‘২৪ ঘণ্টাই জেবা-জেবা করত’ প্রিন্সের ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, জেবার প্রতি তার আবেগ ছিল অত্যন্ত গভীর। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার সম্পর্কও ছিল ঘনিষ্ঠ। কিন্তু বিয়ের পর ধীরে ধীরে তার চিন্তা ও কথাবার্তার বড় অংশজুড়ে জায়গা করে নেয় জেবা। স্বজনদের দাবি, জেবার ফোন বা মেসেজের অপেক্ষায় থাকতেন তিনি। মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, কখন স্ত্রী যোগাযোগ করবেন—সেই অপেক্ষায়। পরিবারের ভাষ্য, ভালোবাসার সম্পর্কটি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা প্রিন্স কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তার কাছে সম্পর্কটি ছিল বিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্নের বিষয়। ‘টাকা দিয়ে সব ভালোবাসার মূল্য দেওয়া যায় না’ প্রিন্সের স্বজনদের মধ্যে এখন ক্ষোভের পাশাপাশি রয়েছে গভীর বেদনা। তাদের প্রশ্ন—অর্থ, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে কি একজন মানুষের আন্তরিক ভালোবাসার মূল্য নির্ধারণ করা যায়? পরিবারের দাবি, প্রিন্স তার বাবা-মা ও বোনকে যেমন ভালোবাসতেন, বিয়ের পর জেবাকেও গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন। তার সেই বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার আশংকায় তাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে বলে তারা মনে করছেন।
তবে পরিবারের আবেগপূর্ণ বক্তব্যের পাশাপাশি তদন্তে প্রমাণ-নির্ভরভাবে দেখা প্রয়োজন, প্রিন্সের মৃত্যুর আগে তার মানসিক অবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন এসেছিল, কার সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল, কোনো হুমকি বা চাপের ঘটনা ঘটেছিল কি না এবং ৮ সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি তার ওপর কী প্রভাব ফেলেছিল।
মৃত্যুর কারণ জানতে তদন্তের দাবি, প্রিন্সের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এখন সবচেয়ে বড় দাবি—ঘটনার নেপথ্যের সত্য উদ্ঘাটন।
স্বজনদের অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলোর আইনগত ও তদন্তগত যাচাই প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রিন্সের মৃত্যুর আগে তার ফোনে যোগাযোগ, মেসেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কথোপকথন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য খতিয়ে দেখা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি, কারও বিরুদ্ধে পূর্বধারণা নিয়ে নয়, বরং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে। প্রিন্সের মৃত্যু যদি কোনো ধরনের চাপ, নির্যাতন বা প্ররোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে থাকে, তাহলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তারা। একদিকে একমাত্র সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে মৃত্যুর নেপথ্যের কারণ নিয়ে অজস্র প্রশ্ন—এই দুইয়ের ভারে আজ বিধ্বস্ত প্রিন্সের পরিবার। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ—এই নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে এখন পরিবারের একটাই প্রশ্ন মাত্র ১৮ বছরের প্রিন্স কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো? এই প্রশ্নের উত্তর আবেগে নয়, প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্তে। সত্যিই যদি তার মৃত্যুর আগে কোনো অন্যায়, চাপ, অপমান বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটে থাকে, তবে সেই সত্য উদ্ঘাটনই হতে পারে শোকাহত পরিবারের জন্য ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ।