ঝালকাঠিতে নামের আংশিক মিলের কারণে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত মামলার আসামি না হয়েও এক ব্যক্তিকে থানায় নিয়ে প্রায় এক দিন এক রাত আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদ ও তথ্য সংগ্রহ করায় সংবাদকর্মী মো. মোল্লা শাওনের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে ঝালকাঠি থানা পুলিশের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ব্যাংকের মামলার আসামি আজাদ হোসেনের সঙ্গে নামের কিছুটা মিল থাকায় আজাদ খান নামে অন্য এক ব্যক্তিকে ভুলভাবে শনাক্ত করে থানায় নেওয়া হয়। পরে পরিচয় ও ঠিকানা যাচাই করে তাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও, ওই আজাদ খানকেই সংবাদকর্মী মোল্লা শাওনের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
ঘটনার সূত্রপাত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঝালকাঠি শাখার একটি ঋণসংক্রান্ত মামলা নিয়ে। ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, মামলার আসামি আজাদ হোসেন, পিতা মহসিন হাওলাদার, গ্রাম পেংরি, থানা রাজাপুর, জেলা ঝালকাঠি।
অন্যদিকে যাকে পুলিশ আটক করে থানায় নেয় বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, তার নাম মো. আজাদ খান, পিতা—মহসিন খান, গ্রাম দৈলকুঠি, ধানসিঁড়ি, ঝালকাঠি সদর। পরিবারের দাবি, আজাদ হোসেন ও আজাদ খান সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি এবং তাদের পিতার নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য পরিচয়গত তথ্যও আলাদা।
আজাদ খানের পরিবারের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র ও নথি যাচাই না করেই তাকে থানায় নেওয়া হয় এবং প্রায় এক দিন এক রাত সেখানে রাখা হয়। পরে বিষয়টি জানার পর সংবাদকর্মী মো. মোল্লা শাওন ব্যাংকের মামলার নথি, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে তিনি ভুল ব্যক্তিকে থানায় নেওয়ার বিষয়টি পুলিশের নজরে আনেন বলে পরিবারের দাবি।
পরিবারের দাবি, সাংবাদিকের প্রতিবাদ ও তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের পর আজাদ খানকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপরই ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। অভিযোগ ওঠে, আজাদ খানকে বাদী দেখিয়ে সংবাদকর্মী মোল্লা শাওনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
আজাদ খান বলেন, “আমাকে মিথ্যাভাবে ফাঁসানোর কারণে আমি অনেক হয়রানির শিকার হয়েছি। বিষয়টি ঝালকাঠির অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে জানাতে গেলে ঝালকাঠি থানার এসআই জালাল আমাকে থানায় নিয়ে যান। পরে নাম-ঠিকানা যাচাই করে আমার নামে কোনো মামলা বা অভিযোগ না থাকলেও আমাকে এক রাত এক দিন থানায় রাখা হয়। এরপর সাংবাদিক মোল্লা শাওনের বিরুদ্ধে একটি মামলায় স্বাক্ষর নিয়ে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আমি ওই মামলা বা দরখাস্ত পড়ার সুযোগও পাইনি।”
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ঝালকাঠি শাখার সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা হলেন আজাদ হোসেন, পিতা মহসিন হাওলাদার। তার বিরুদ্ধেই ব্যাংকের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। আজাদ খান, পিতা মহসিন খান নামে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যাংকের কোনো মামলা বা অভিযোগ নেই। তাদের ভাষ্য, আজাদ হোসেন ও আজাদ খান দুই ব্যক্তি এবং ভুলবশত আজাদ খানকে গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকলে বিষয়টির তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে সাংবাদিক মোল্লা শাওনের অভিযোগ, পুলিশের বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে আসামি ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। তার ভাষ্য, এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের পর কিছু কথিত সাংবাদিক পুলিশকে ভুল বুঝিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করাতে ভূমিকা রেখেছেন।
মোল্লা শাওন বলেন, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেটি যাচাই-বাছাই না করে তাকে রক্ষা করতে একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে বাদী বানিয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হয়েছে বলে আমি মনে করি। আমি নির্দোষ। তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসবে। এ বিষয়ে আমার কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে এবং জেলার সিনিয়র সাংবাদিকরাও বিষয়টি অবগত আছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, ব্যাংকের মামলার আসামি যদি আজাদ হোসেন হয়ে থাকেন এবং আজাদ খান ওই মামলার আসামি না হন, তাহলে পরিচয় যাচাইয়ের পর তাকে থানায় নেওয়া ও আটকে রাখার বিষয়টি কীভাবে ঘটল এবং পরবর্তীতে কী প্রক্রিয়ায় তাকে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী করা হলো—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
তাদের মতে, ভুল ব্যক্তিকে শনাক্ত করে থানায় নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে সেটিরও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে সেটিও আইন অনুযায়ী তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ঝালকাঠি থানার তদন্ত কর্মকর্তা মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের বলেন, “ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত চলমান রয়েছে।
স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সচেতন নাগরিকরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাদের দাবি, আজাদ খানকে কেন থানায় নেওয়া হয়েছিল, কীভাবে তাকে শনাক্ত করা হয়েছিল, পরে কোন প্রক্রিয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং সাংবাদিক মোল্লা শাওনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার পেছনে প্রকৃত ঘটনা কী এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
ঘটনাটি নিয়ে ঝালকাঠিতে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত, হয়রানির অভিযোগের প্রতিকার এবং সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।