রূপালি মৎস্যে স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নীলফামারীর ডিমলায় নানা আয়োজনে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি, আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণ ও মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয়ভাবে ১৬ থেকে ৩০ আগস্ট মৎস্য পক্ষ উদযাপন করা হচ্ছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) সকাল ৯টায় উপজেলা পরিষদ চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়। পরে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরের আয়োজনে আলোচনা সভা, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়।
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন নীলফামারী-১ (ডোমার-ডিমলা) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ আব্দুস সাত্তার। স্বাগত বক্তব্য দেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) রওশন কবির, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না, ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শওকত আলী সরকার, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা অধ্যাপক রইসুল আলম চৌধুরী, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ মনোয়ার হোসেন ও গোলাম রব্বানী প্রধান, উপজেলা জামায়াতে ইসলামী আমির অধ্যাপক মাওলানা মজিবুর রহমানসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মৎস্যচাষি, মৎস্যজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
উপজেলা পর্যায়ে মৎস্য উৎপাদনে সফলতা ও মৎস্য খাতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনজন মৎস্যচাষিকে পুরস্কার দেওয়া হয়। পরে উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের সিঙ্গাহারা নদীতে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়।
আলোচনা সভায় দেশের খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে মৎস্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বর্তমানে দেশে মোট মাছের উৎপাদন ৫ দশমিক ১১ লাখ মেট্রিক টন। মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণের পরিমাণ ৬৭ দশমিক ৮০ গ্রাম। মৎস্য খাত দেশের প্রায় ১৪ লাখ নারীর ২ কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষের জীবিকার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত।
জাতীয় অর্থনীতিতেও মৎস্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) মৎস্য খাতের অবদান ২ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অবদান ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ। মৎস্য খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৪১ শতাংশ।
দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বাড়াতে নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা এবং মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ক্ষতিকর ও অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি মাছের প্রজনন মৌসুমে সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়।
মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে খামার যান্ত্রিকীকরণের পাশাপাশি আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় মৎস্যচাষ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে প্রযুক্তির প্রয়োগ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ ও মানসম্মত মাছ উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়।
দেশীয় মাছের উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পোনা অবমুক্তকরণ, মৎস্য হ্যাচারি আধুনিকায়ন, খাঁচায় মাছ চাষের সম্প্রসারণ এবং মৎস্য অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে ৮২৭টি মৎস্য অভয়াশ্রম রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৮১ দশমিক ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৫টি অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি প্রসঙ্গে জানানো হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৬ হাজার ১৪৪ দশমিক ৯১ কোটি টাকা মূল্যের ৯০ হাজার ৬১৯ দশমিক ৪২ মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত দ্রব্য রপ্তানি করেছে। রপ্তানি আরও বাড়াতে চিংড়ি উৎপাদনে ক্লাস্টার পদ্ধতি প্রবর্তন, মান নিয়ন্ত্রণে HACCP পদ্ধতি অনুসরণ, বিশ্বমানের মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং ই-ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দেশের মৎস্যসম্পদে ইলিশের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ইলিশ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে দ্বিতীয়, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে তৃতীয়, বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে পঞ্চম এবং সামুদ্রিক ও উপকূলীয় জলাশয়ে ফিনফিশ আহরণে বাংলাদেশ অষ্টম অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে, মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবহার, আধুনিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, জলজ পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিরাপদ ও মানসম্পন্ন মৎস্যপণ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণ ও মৎস্যসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মৎস্য খাতকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।